এক সময় জামালপুরের গ্রামীণ বিয়েতে অনিবার্য ছিল নকশী কাঁথা। নতুন কনের শ্বশুর বাড়ি যাত্রায় নকশী কাঁথা নেওয়ার রেওয়াজ ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসছে এ অঞ্চলে। সময়ের সঙ্গে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই নকশী কাঁথা শিল্প আবার জেগে উঠেছে জামালপুর জেলাজুড়ে। নকশী সূঁচি শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসারে দরিদ্র এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। জেলায় অসংখ্য দরিদ্র নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু বিপণন সমস্যা আর পুঁজির অভাবে শ্রমের ন্যায্য মজুরি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রায় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ নকশী সূঁচি শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসার জামালপুরে শুরু হয় আশির দশকের শুরুর দিকে। বর্তমানে জামালপুর সদরসহ পুরো জেলায় প্রায় ২৫ হাজার দরিদ্র নারী এবং ৫০ হাজার পুরুষ এই পেশায় জড়িয়েছেন। এতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে অনেক হত দরিদ্র নারী। সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা ঘরে বসেই নকশী কাঁথা, নকশী চাঁদর, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কটি, ওয়ালম্যাট, কুশন কভার, শাড়ির নকশী পাড়, থ্রী-পিস ওড়নাসহ নানা রকম নকশী সামগ্রীর সূচিকর্ম করছেন।
এ ছাড়াও বাড়তি আয়ের জন্য অনেক শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিনীরাও এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। শহরের পাড়া মহল্লায় গড়ে উঠেছে এ শিল্পের অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান। পুরনো ঐতিহ্য ও নকশা অনুসরণ করে গ্রামীণ নারীরা সূঁচ, সুতা-রঙের সমন্বয়ে কাঁথাসহ এই সব দ্রব্যে নানা সৌন্দর্য তাদের নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলেন।
জামালপুরের নকশী পণ্যের কদর বাড়ছে দেশে-বিদেশে। জামালপুর জেলা শহরেও রয়েছে এ শিল্পের ছোট-বড় অনেক শো-রুম। কিন্তু বিপণন সমস্যা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর পুঁজির অভাবে শ্রমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এখানকার নারী কর্মীরা। ইচ্ছে মতো মালিকের দেয়া অল্প মজুরিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। আর স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি নকশী কাঁথা তৈরি করতে মজুরিসহ খরচ হয় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। ঢাকার পাইকারী ব্যবসায়ীদের নিকট তা বিক্রি করতে হয় ২ হাজার টাকায়। এই কাথা ঢাকার বড় বড় বিপণি-বিতানগুলোতে বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। পুঁজির অভাবে তারা নিজেরা বাজারজাত করতে পারছেন না এসব পণ্য। ফলে পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে নিজেরা যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনী যথাযথ শ্রমমূল্য পাচ্ছেন না নারী শ্রমিকরা।
হস্ত শিল্প এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, হস্তশিল্প ব্যবসায়ীদের পুঁজি সংকটের কথা মাথায় রেখে পৃষ্টপোষকতায় এগিয়ে এসেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। হস্তশিল্প ব্যবসায়ীদের মাঝে চালু করেছে এসএমই ঋণ কার্যক্রম। আরও অন্যান্য অর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সহায়তা পেলে এখানকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি এসব সূঁচি পণ্য ঢাকাসহ বড় শহরে নিজেরাই বিপণন করতে পারবে।
দেশের বাইরেও পণ্যটির রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। রফতানি করতে পারবে বিদেশেও। দেশের গার্মেন্ট শিল্পের পরেই জামালপুরের হস্তশিল্প দেশের অর্থনীতির প্রাণ প্রবাহ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন হস্ত শিল্প সংশ্লিষ্টরা। হস্তশিল্প পণ্যের নিজস্ব বাজার গড়ে উঠলে হত দরিদ্র নারী শ্রমিকরা একদিকে যেমন তাদের সঠিক শ্রমমূল্য পাবেন, পাশাপাশি এ জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রও পুরো পাল্টে যাবে।
সুত্র: priyo.com


