ব্রহ্মপুত্রের তীরঘেঁষা জামালপুরের গ্রামগুলোতে শীতের মিষ্টি রোদ উঠতেই উঠোনে মাদুর পাতা হয়। সেই মাদুরে বসে সুতি কাপড়ের ওপর সুঁই-সুতো দিয়ে জীবনের গল্প বোনেন নারীরা। Nakshi Kantha Handicraft of Jamalpur কোনো যান্ত্রিক কারখানা থেকে আসে না; এটি তৈরি হয় গ্রামীণ নারীর ধৈর্য, সময় ও বংশপরম্পরায় পাওয়া কারিগরি দক্ষতার মেলবন্ধনে। প্রতিটি ফোঁড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে দিনের পর দিন একাগ্র সাধনা।
জামালপুরের নকশিকাঁথার ভৌগোলিক স্বীকৃতি ও ঐতিহ্য
জামালপুরের নকশিকাঁথা বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা GI (Geographical Indication) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি বিশেষ হস্তশিল্প। এখানকার কাজের মূল বৈশিষ্ট্য হলো কাপড়ের বুনন এবং সূক্ষ্ম ফোঁড়। সাধারণ কাঁথা সেলাই যেখানে কেবল স্তরীভূত কাপড় আটকে রাখার জন্য করা হতো, সেখানে জামালপুরের কারিগররা কাপড়কে রূপ দেন ক্যানভাসে।
বুননে ব্যবহৃত হয় বিশুদ্ধ সুতি কাপড় (cotton) এবং টেকসই রঙিন সুতো। মূলত দুটি প্রধান ধারা এখানে দেখা যায়—পাড়ের নকশা এবং জমিনের নকশা। মাছ, পদ্মফুল, ময়ূর, কলকা, ধানের শিষ এবং গ্রামীণ জীবনের নানা মুহূর্ত নিখুঁতভাবে সুঁইয়ের আগায় ফুটে ওঠে। কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে একেকটি কাঁথা শেষ করতে তিন সপ্তাহ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
জনপ্রিয় সেলাই ও নকশার বৈচিত্র্য
জামালপুরের কাঁথায় ফোঁড়ের বৈচিত্র্যই এর আসল পরিচয়। কোনো কাঁথা হয় ভারী কাজের, কোনোটি আবার হালকা বুননে আরামদায়ক।
- তেরছা ও ডাল সেলাই: লতাপাতা ও ফুলের ডাল ফুটিয়ে তুলতে এই ফোঁড় ব্যবহৃত হয়, যা নকশাকে একটি স্পষ্ট রূপরেখা দেয়।
- বোরফি ও জালি ফোঁড়: জ্যামিতিক নকশা এবং জমিন ভরাট করতে কারিগররা এই সূক্ষ্ম ফোঁড় ব্যবহার করেন। এতে কাঁথা ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
- রানি ফোঁড় ও বখিয়া: পুরো কাঁথার স্তরগুলো এক রাখতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম রানি ফোঁড় দেওয়া হয়, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় কাপড়ের নিজস্ব বুনন।
ঘরে ব্যবহারের উপযোগিতা ও ঋতুভিত্তিক ব্যবহার
আমাদের দেশে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে নকশিকাঁথার ব্যবহারে ভিন্নতা আসে। অনেকেই এটিকে কেবল শীতের অনুষঙ্গ মনে করেন, কিন্তু সুতি কাপড়ের তৈরি আসল নকশিকাঁথা সারা বছরই ব্যবহারযোগ্য।
হালকা শীত ও এসির ঠাণ্ডায়
গ্রীষ্মের রাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (AC) ঘরে কিংবা হেমন্তের হালকা ঠাণ্ডায় দুই বা তিন স্তরের সুতি কাঁথা শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দারুণ কাজ করে। এর প্রাকৃতিক সুতো বাতাস চলাচলে বাধা দেয় না, ফলে ঘাম হয় না।
বিয়ে ও গৃহপ্রবেশে উপহার
নতুন সংসার সাজাতে কিংবা প্রিয়জনের বিশেষ দিনে উপহার হিসেবে হস্তশিল্পের চেয়ে রুচিশীল আর কিছু হতে পারে না। একটি হাতে সেলাই করা বিছানার চাদর বা নকশিকাঁথা ঘরের পরিবেশকে তাৎক্ষণিকভাবে মার্জিত করে তোলে। ড্রয়িংরুমের সোফায় থ্রো (throw) হিসেবে রাখলে তা আভিজাত্যের ছোঁয়া দেয়।
আসল কাঁথা চেনার সহজ উপায়
অনলাইন বা বাজারে আজকাল মেশিনে তৈরি প্রিন্ট করা কাঁথা বিক্রি হয়, যা অনেকেই হাতের কাজ ভেবে ভুল করেন। কেনার আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
- উল্টো পিঠের ফোঁড় পরীক্ষা: হাতের কাজের কাঁথার পেছনের দিকে সুতোর ছোট ছোট গিঁট এবং নিখুঁত অসমতা দেখা যাবে। মেশিনের কাজ হলে উল্টো পিঠ একেবারে যান্ত্রিক ও সমান্তরাল দেখাবে।
- কাপড়ের ওজন ও ঘনত্ব: খাঁটি সুতি কাঁথা হাতে নিলে নরম অথচ নির্দিষ্ট ভার অনুভূত হবে। অতিরিক্ত সিন্থেটিক মিশ্রণ থাকলে কাপড় পিচ্ছিল লাগবে।
- রঙের স্থায়িত্ব: ভালো মানের কাঁথায় পাকা রঙের সুতো ব্যবহার করা হয়, যা পানিতে ভিজলে সহজে ছড়িয়ে পড়ে না।
সঠিক যত্ন ও ধোয়ার নিয়ম
সঠিক নিয়মে যত্ন নিলে একটি ভালো কাঁথা যুগ যুগ ধরে সুন্দর থাকে। যেহেতু এটি হাতে তৈরি, তাই ওয়াশিং মেশিনে তীব্র স্পিন দিয়ে এটি ধোয়া উচিত নয়।
পরিষ্কারের জন্য সাধারণ ঠাণ্ডা পানিতে মাইল্ড ডিটারজেন্ট বা শ্যাম্পু গুলে কাঁথা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন। জোরে ঘষাঘষি না করে হালকা হাতে চেপে ধুয়ে নিন। কড়া রোদে সরাসরি না শুকিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে মেলে দিন, এতে কাপড়ের সুতো ও উজ্জ্বল রং নষ্ট হয় না। সংরক্ষণের সময় মাঝে মাঝে বের করে বাতাসে দিন এবং অবশ্যই আর্দ্রতামুক্ত পরিষ্কার জায়গায় রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জামালপুরের নকশিকাঁথা ধোয়ার সঠিক নিয়ম কী?
নকশিকাঁথা সবসময় ঠাণ্ডা পানিতে মাইল্ড লিকুইড ডিটারজেন্ট দিয়ে হালকা হাতে ধোয়া উচিত। ওয়াশিং মেশিনে না ধুয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে শুকাতে দিলে সুতোর রং ও সেলাই অনেক বছর ভালো থাকে।
মেশিনের কাঁথা আর জামালপুরের হাতের কাজের কাঁথার পার্থক্য কীভাবে বুঝব?
হাতের কাজের কাঁথার উল্টো পিঠে ছোট ছোট গিঁট ও প্রাকৃতিক সেলাইয়ের টান দেখা যায়। মেশিনের কাঁথা অতিরিক্ত নিখুঁত ও সমান্তরাল হয় এবং কাপড়ে সেই ঐতিহ্যবাহী ফোঁড়ের প্রাণবন্ত ভাব থাকে না।
নকশিকাঁথা কি গরমের দিনে ব্যবহার করা যায়?
হ্যাঁ, খাঁটি সুতি কাপড়ে তৈরি ২-৩ স্তরের কাঁথা গ্রীষ্মের রাতে এসির ঠাণ্ডায় ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। সুতি কাপড়ে বাতাস চলাচল করতে পারে বলে অস্বস্তি হয় না।

